শুধু দেড়শো বছর আগে নয়, আজকের দিনেও ওই রকম ঘটনায় লোকে চমকে উঠতই। ১৮৩৫ সালে বর্ধমানের জমিদার বাড়িতে পনেরো বছর আগে মরে-যাওয়া রাজা প্রতাপচাঁদ সশরীরে ফিরে এসেছিলেন। চারপাশে হই হই কাণ্ড। যেন ঢিল পড়ল শান্ত পুকুরে, জল ঘুলিয়ে উঠল। তারপর হরেক রকমের ছোট-বড় ঢেউ— কোনওটা উঠেই মিলিয়ে গেল, কোনওটা ছড়িয়ে পড়ল পুকুরময়। বড়লোকি কেচ্ছা, স্বত্বের দাবি, কোম্পানির আমলাদের প্যাচ-পয়জার, বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের দলাদলি, মোকদ্দমার হুড়োহুড়ি, আদালতি সাক্ষ্য তত্ত্বের রূপান্তর, এই রকম নানা বৃত্তে ঘটনাটি সংলগ্ন ছিল। অথচ ঘটনাটি সাকুল্যে একটি; কিন্তু তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছিল সমসাময়িক সমাজের নানা দিকে। রহস্যের গলিঘুজির আর অন্ত ছিল না। প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে এই অলিগলিতেই বাঙালির আত্মসমীক্ষার দলিল খুঁজতে নেমে পড়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের মেজদাদা সুলুকসন্ধানী বাবু সঞ্জীবচন্দ্র, রহস্যসন্ধানীর কায়দায় নামিয়ে দিয়েছিলেন একটি জমাটি ইতিহাসের বই। সেই বইটির গাঁইগোত্র নিয়েও তকরারের আর শেষ নেই, কারণ প্রতাপচাঁদের ফিরে আসার মতো রোমহর্ষক ঘটনা সেদিন কেউ হাতছাড়া করতে চাননি, নিজের মতো করে সবাই বৃত্তান্তটি বলেছেন। সেই কথকদের তালিকাতে আছে সেকালের তাব্বড় সব নাম, পাঁচালিকার দাশরথি রায়, স্বভাবকবি কৃষ্ণকান্ত ভাদুড়ি, এবং কলকাতার সিংহশিশু কালীপ্রসন্ন সিংহ। এঁদের পাশেই তাল ঠুকে দাঁড়িয়ে আছেন আগুরি ভক্ত অনুপচন্দ্র, গুরুর লীলা শোনাতে তিনিও পেছপা নয়। উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের টানাপড়েনে রাজার ফিরে-আসা রহস্যবিচার যেন নানা ভঙ্গি ও ঢঙের অতীতচর্চারও রকমারি নিদর্শন। বর্তমান ও অতীতের আলাপচারিতার সূত্রে স্বত্ব ও পরিচিতি নির্ণয়ের সেই মামলা হয়ে উঠল উনিশ শতকের বাঙালি জীবন, সমাজ ও ইতিহাসচেতনা গড়ে ওঠার একটা পর্বকথা।