বিশ শতকের চল্লিশের দশকে একটি সাড়া-জাগানো চলচ্চিত্র, বিমল রায় পরিচালিত ‘উদয়ের পথে’। উত্তর কলকাতার একটি সিনেমা হলে টানা তিন বছর চলেছিল সেই বাংলা কাহিনী-চিত্র। ‘হাম রহি’ নামে তার হিন্দি রূপান্তরও চিহ্নিত হয়েছিল যুগান্তকারী বলে। এই চলচ্চিত্রের পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের মতোই সেদিন রীতিমতো একটি চাঞ্চল্যকর নাম, তার কাহিনী ও চিত্রনাট্য লেখক—জ্যোতির্ময় রায়। ‘উদয়ের পথে’-র মতো তাঁর কথাও সকলের মুখে মুখে। দেখতে দেখতে ‘উদয়ের পথে’— ‘বেস্ট সেলার’! তারপর জ্যোতির্ময় রায়ের কাহিনী অবলম্বনে আরও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, এমনকী তিনি নিজেও অবতীর্ণ হয়েছেন নিজের লেখা কাহিনীচিত্রের পরিচালকের ভূমিকায়। তবু চলচ্চিত্রের পরিমণ্ডলেই আবদ্ধ ছিলেন না জ্যোতির্ময় রায়। উপন্যাস ছাড়াও তিনি সমকালের একজন বিশিষ্ট গল্পলেখক এবং প্রাবন্ধিক। চল্লিশের দশকে মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর এবং অস্থির রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশে বাংলায় যে নবযুগের নতুন সাহিত্যের সূচনা, তাতে লেখক জ্যোর্তিময় রায়ের অবদানও অবশ্যই তুচ্ছ করার মতো নয়। ভাঙনের মুখে বিবেকহীন, বিচারহীন যুগে পাপপুণ্য, ভালমন্দ যখন একাকার, তমসার সেই পটভূমিতে লেখা জ্যোতির্ময় রায়ের ছোটগল্প শুধু বঞ্চিতের প্রতি সহমর্মিতাই নয়, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার। কিন্তু কোথায়ও তা শ্লোগান-এ পর্যবসিত হয়নি, শিল্পের সব শর্ত পূরণ করেই প্রবাহিত লেখকের গভীর মানবিকতা। ঠিক তেমনই শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্র-নানা বিষয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধ থেকে বোঝা যায়, যুক্তিবাদী মন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর মননশীলতার মতো সর্বব্যাপ্ত লেখকের সমাজ সচেতনতা। তাঁর ব্যক্তিগত প্রবন্ধ বা রম্যরচনায় আবার সহজ স্বছন্দ, বৈদগ্ধের তিক্ত মধুর রসের আশ্চর্য মিশ্রণ। প্রতিটি রচনা লেখকের অনভূতির গভীরতা এবং একান্ত আপন দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর। বস্তুত, রম্যরচনায় বাংলাভাষায় তাঁর স্থান, যে কোনও মানদণ্ডে, অবশ্যই প্রথম সারিতে। বেশ কিছুকাল পরে, গত শতকের সোনালি চল্লিশের দশকের একজন বিস্মৃতপ্রায় লেখকের রচনাসংগ্রহ একালের পাঠকদের হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। যে কোনও পাঠক স্বীকার করবেন, এই সব রচনা চিরকালের মতো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলে সেটা হত বাংলা সাহিত্য-শিল্পের অপূরণীয় ক্ষতি।